সত্য বড়ই করুণ
লেখক : লেঃ কর্নেল (অবঃ) শরিফুল হক ডালিম
প্রকাশনী : প্রগতি পাবলিশার্স
পৃষ্ঠা : ৪০২ টি, কভার : পেপারব্যাক
পৃষ্ঠার মান : ৭০ gsm
সময়টা ২০০৮। তখন আমি ক্লাস সিক্সের ছাত্র, ক্লাসের বই পড়ার চেয়ে নীলক্ষেতের সামনে থেকে সমরেশ বসু, বুদ্ধদেব গুহ, ফেলুদা, মেমসাহেব আর যাযাবরের বই পড়ার প্রতি ঝোঁক ছিল বেশি। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় বাবা আমাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য করেছিলেন। সেখান থেকে আনা বইগুলো ছিল মায়ের হাতের রান্নার মতো—গোগ্রাসে গিলতাম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোকের বইয়ের কালেকশন বেশ সমৃদ্ধ, তবে বেশিরভাগই ইংরেজি। এর মধ্যে কিছু বাংলা বইও ছিল—‘মেমসাহেব’ আর কাকাবাবু সমগ্র ওখানেই পড়ে ফেললাম। বই খুঁজতে খুঁজতে বাঁশের কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট পেলাম। ওপরে সুন্দর হাতের লেখায় লেখা ছিল “সত্য বড়ই করুণ”। নামটা দেখে কৌতূহল জন্মাল। প্যাকেটটা খুলে বইটা পড়ার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু বইয়ের মালিক সামনে থাকায় আর খুলে দেখা হয়নি।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে অধীর আগ্রহে বাঁশের কাগজে মোড়ানো প্যাকেট খুললাম। আমি অভিভূত! ভেতরে কোনো বিশেষ কিছু থাকবে ভেবেছিলাম, কিন্তু পেলাম একটি সাধারণ বই। শুরু করলাম পড়া— "আমি মেজর ডালিম বলছি"।
কিসের যেন মোহে আমি বইটির পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে চলেছি। মা দুইবার দুপুরের খাবারের জন্য ডাকলেন। ক্ষুধা নেই বলে আবার পড়া শুরু করলাম। একটানা পড়তে পড়তে রাত ১২টা নাগাদ বইটি শেষ করলাম, তবুও কেন যেন মনে হচ্ছিল কিছু বাকি রয়ে গেছে। আবার পড়া শুরু করলাম। এবার মশারির ভেতর শুয়ে শুয়ে পড়ছি, কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টের পাইনি।
পরদিন সকালেও বইটির প্রতি আমার আগ্রহ এতটুকু কমেনি। এমনকি জুমার নামাজের সময়ও নামাজে না গিয়ে আমি বইটি পড়তেই থাকি। বাবা খেয়াল করলেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে সমাজ বইয়ের নিচে লুকিয়ে রাখা "আমি মেজর ডালিম বলছি" পড়তে ব্যস্ত ছিলাম। নীরবে পিছন থেকে এসে বাবা এক ঝটকায় বইটি নিয়ে নিলেন। তারপর শুরু হলো বকাঝকা এবং এক-আধটা চপটাঘাতও। বাবার ভাষায়, "আজে-বাজে বই পড়ছি আর পরীক্ষায় ডাব্বা মারছি।"
সেদিন ভয়ে বাবাকে কিছু বলতে পারিনি। বলতে পারিনি বইটা আজে বাজে নয়? কিন্তু আজ বলছি—এই বইটা সবারই পড়া উচিত। সত্যিকারের বাস্তবতা এতটা করুণ হতে পারে, সেটা এই বই থেকেই বুঝতে পেরেছি।
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনের দুই ঘণ্টার লাইভ দেখে মনে হলো যেন আমি তার সামনেই বসে আছি, তার উদ্দীপক, বজ্রকঠিন অথচ কোমল সত্যগুলো শুনে চলেছি। সত্য এক অদ্ভুত শক্তি। এটি তাড়া করে ফেরে, কিন্তু একে সহজে মেনে নেওয়া যায় না। সত্য এত নিষ্ঠুর যে, তা স্বীকার করাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই সত্যের ভয়ই বছরের পর বছর ধরে ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনাকে পিছু ছাড়েনি। তিনি কখনো চাননি, মানুষ জানুক যে তার বাবা ছিলেন ভারতীয় শাসনের প্রভাবাধীন একজন নেতা।
সত্য গোপন রাখতে তিনি একে একে দেশের বীর সন্তানদের হত্যা করেছেন। অথচ সেই সত্য এখনো উদ্ঘাটিত হচ্ছে এবং আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। আমরা নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে, ভারতীয় প্রভাবের তলে গিয়ে দালালী, চাটুকারিতা এবং পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছি। বিডিআর হত্যাকাণ্ড থেকে শাপলা চত্বরের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত ভারতীয় থাবার গ্রাস আমাদের দেশের ওপর বিরাজ করছে। কিন্তু তবুও আমরা নিজেদের বোধ জাগ্রত করতে পারিনি। আমাদের সমাজ যেন এক শীত নিদ্রায় নিমগ্ন।
কবি ফররুখ আহমেদ এর পাঞ্জেরীর লাইন মনে পড়ে যায়—
“রাত পোহাবার কত দেরি, পাঞ্জেরী,
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।
সম্মুখে শুধু অসীম কুয়াশা হেরি,
পথহারা এই দরিয়া সোঁতারা ঘুরে
চলেছি কোথায়? কোন সীমাহীন দূরে?”
আমরা কি পারব সেই কুয়াশা ছিন্ন করে আলোর পথে এগিয়ে যেতে? আমরা কি পারব নিজেদের হারানো বোধ ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে? সত্যকে মেনে নিয়ে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় কি এখনও আসেনি?
.png)

Comments
Post a Comment